সিজারের পর মা ও শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া

0

 

সিজারের পর মা শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া গুলো কি কি ? সম্পর্কে জানতে হলে বিস্তারিত পড়ুন

সিজারের পর মা ও শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া
ছবি:সংগৃহিত

সিজারিয়ান অপারেশনের সময় গর্ভবতী মা গর্ভস্থ শিশুর দুজনের শরীরের অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। যার জন্য সাধারণত ডাক্তাররা সিজার বা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে মায়ের জরায়ু থেকে বাচ্চা বের করে নিয়ে আসেন। সি-সেকশনে বাচ্চা প্রসবের কারণে মা শিশু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে রেহাই পেলে এই অপারেশনের সময় মা শিশু দুজনের শরীরের উপর যে প্রেসার পড়ে তা থেকে সেরে উঠতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মা শিশু দুজনেই যদি পর্যাপ্ত যত্ন পায় তাহলে খুব শীঘ্রই সিজার পরবর্তী জটিলতা কাটিয়ে উঠে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ সিজারিয়ান মায়ের কাছেই প্রসব পরবর্তী যত্নের বিষয় গুলো অজানা থাকে। সেজন্য মা শিশু দুজনেকেই বিভিন্ন ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। তাই সিজারের পর মা শিশুর যত্নের বিষয় গুলো সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

এখন চলুন সি-সেকশনের পর মা শিশুর যত্নের প্রক্রিয়া গুলো জেনে নেওয়া যাক,

 

সিজারের পর মা শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া গুলো কি কি ?

সি-সেকশনের পর মা শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া গুলো সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো

নিয়মিত হাঁটা-চলা করা :

অনেক সিজারিয়ান মায়েরা মনে করেন যে, সি-সেকশনের পর সব সময় শুয়ে-বসে থাকতে হবে। তা না হলে তাদের শরীর খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ একটি ভ্রান্ত ধারণা। অপারেশন করার পরে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আপনি অন্যের help ছাড়া বেড থেকে উঠার চেষ্টা করবেন এবং নিজে নিজে বাথরুমে যাবেন। নিজেকে সক্রিয় রাখার ফলে আপনার ক্ষত স্থান দ্রুত শুকাবে। শুরুতে আপনার হাঁটতে সমস্যা হতে পারে সে জন্য হাঁটার সুবিধার্থে আপনি belt ব্যবহার করতে পারেন।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসে পরের দিন থেকেই আপনি হালকা হাঁটাচলা শুরু করবেন। প্রথম ছয় থেকে আট সপ্তাহ খুব অল্প করে হাঁটবেন এবং ধীরে ধীরে যখন সিজারিয়ান জটিলতা গুলো কমতে থাকবে তখন হাঁটার সময় বাড়িয়ে দিবেন। এতে করে আপনার শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকবে, সেলাই দ্রুত শুকাবে, শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি বার্ন হবে। ব্যথা কমতে থাকবে এবং এর পাশাপাশি আপনার এনার্জি লেভেল বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।

পর্যাপ্ত পানি পান করা :

পানি আমাদের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয়তা মেটায়। সি-সেকশনের পর আপনাকে সুস্থ রাখতে পানির কোন বিকল্প নেই। কারণ অস্ত্রোপচারের সময় রক্তের সাথে আপনার শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে তরল পদার্থ বেরিয়ে যায়। যার জন্য সিজারের পর আপনার শরীরে পানির প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাবে। এর ফলে ঘন ঘন পানির পিপাসা পাবে। আর পিপাসা পাওয়ার সাথে সাথে আপনাকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে।

এছাড়াও পানি পান করার ফলে আপনার বুকের দুধের মাধ্যমে বাচ্চার শরীরে পানির চাহিদা পূরণ হবে। এতে করে আপনার বাচ্চাকে আলাদা করে পানি খাওয়ানোর প্রয়োজন হবে না। পানি পান করার ফলে আপনার শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ গুলো প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে চলে যাবে। এর ফলে আপনার কোষ্টকাঠিন্য, প্রস্রাবের প্রদাহ এবং রক্ত জমাট বাধা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়ার ঝুঁকি কমে যাবে।

নরম খাবার খাওয়া :

অস্ত্রোপচারের পরপরই আপনি স্বাভাবিক খাবার খেতে পারবেন না। স্বাভাবিক খাবার বা শক্ত খাবার খেলে আপনার বমি হতে পারে। এই বমি না হওয়ার জন্য সিজারের পর, প্রথম কয়েক ঘণ্টা আপনাকে নরম খাবার যেমনঃ জাউ, স্যুপ প্রভৃতি খেতে হবে। এর ফলে আপনার বমি হবে না।

স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া :

সিজারে বাচ্চা প্রসবের পরে আপনার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। বুকের দুধ তৈরী হওয়ার জন্য সময় আপনার শরীরে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরির প্রয়োজন হয়। তাই সময় মাকে সঠিকমাত্রায় সুষম খাবার খেতে হবে যার মধ্যে যথেষ্ট পুষ্টিগুণ আমিষ বিদ্যমান থাকবে।

সিজারিয়ান অপারেশনের পর আপনার শরীরে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই ধরণের অপারেশনের পর কোষ্ঠকাঠিন্য হলে আপনার শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপনাকে ডেলিভারির পর আমিষ জাতীয় খাবারের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে আঁশজাতীয় খাবার যেমনঃ সবুজ শাকসবজি,  ফলমূল প্রভৃতি খেতে হবে। তাহলে আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক ভাবে অনেক কমে যাবে।

সেলাইয়ের স্থানের যত্ন নেওয়া :

সি-সেকশনের পর আপনার সেলাইয়ের জায়গায় কেয়ার নিতে হবে। কারণ সেলাই স্থানের ঠিক মত যত্ন না নিলে সেলাই ছিড়ে যাওয়া বা স্থানে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই এসব সমস্যা রোধ করার জন্য আপনাকে প্রতিদিন গোসলের সময় হালকা গরম পানি দিয়ে সেলাইয়ের জায়গাটা পরিষ্কার করতে হবে। তারপর একটি নরম পরিষ্কার কাপড় দিয়ে স্থানটি মুছে নেবেন। মোছার সময় খেয়াল রাখবেন যাতে সেলাইয়ের স্থানে যেন কাপড়ের সাথে ঘষা না লাগে। আর অপারেশন পর থেকে সেলাই শুকনো না পর্যন্ত ঢিলা, পাতলা সুতির আরামদায়ক কাপড় পরিধান করার চেষ্টা করুন।

অপারেশনের পরে প্রথম দিকে আপনার সেলাইয়ের জায়গায় কালচে ফোলা ভাব থাকতে পারে তবে এটি ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু যদি জায়গাটা লাল হয়ে যায়, পুঁজ বের হয় বা ফুলে যায় তাহলে আপনাকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সেলাইয়ের জায়গায় হাঁচিকাশি দেওয়ার সময় ব্যথা করলে জায়গাটাতে হাত বা বালিশ চাপা দিয়ে রাখতে পারেন এতে করে সেলাইয়ে টান পড়বে না।

ভারী কাজ এড়িয়ে চলা :

সিজারিয়ান অপারেশনের পর আপনাকে হেভি এক্সারসাইজ, ভারী কাজ যেমনঃ ভারী জিনিস পত্র উঠানো-নামানো বা বেশি সিঁড়িতে ওঠা-নামা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এসব কাজ করলে আপনার পেটের কাঁচা সেলাইয়ের স্থানে চাপ পড়বে পরবর্তীতে সেলাই ছিড়ে যাওয়ার শঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। এজন্য আপনি পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে ওঠা পর্যন্ত এসব কাজ না করাই উত্তম।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া :

সি-সেকশনের সময় আপনার শরীরের উপর যে প্রেসার পরে তা কাটিয়ে উঠার জন্য আপনাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। তাই অপারেশনের পর বিশ্রাম পর্যাপ্ত না হলে সময় আপনি বিভিন্ন ধরনের জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন।

আপনি যদি ঠিক মত বিশ্রাম বা রেস্ট নেন তাহলে আপনার ক্ষত স্থান দ্রুত শুকাবে, আপনি দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকবেন। এর ফলে আপনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন। এজন্য অস্ত্রোপচারের পর অন্তত প্রথম সপ্তাহ আপনাকে রেস্টে থাকতে হবে।

আরও পড়ুন :প্রথম সিজারের পর নরমাল ডেলিভারি সম্ভব কি না ?

                      প্রথম সিজারের কত দিন পর দ্বিতীয় সন্তান নেয়া নিরাপদ ?

 সি-সেকশনের পর শিশুর যত্ন প্রক্রিয়া :

সিজার পরবর্তী শিশুর যত্নের বিষয় গুলো নিম্নরূপ :

মায়ের কাছে রাখা :

সিজারিয়ান অপারেশনের পর অস্ত্রোপচার হয়েছে বলে অনেকেই শিশুকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা রাখেন। কিন্তু এমনটি করা ঠিক নয়। শিশুর সবকিছু যদি ঠিক থাকে তাহলে দ্রুত তার শরীরের তাপমাত্রা নিশ্চিত করে নরম কাপড় দিয়ে জড়িয়ে তার মায়ের কাছে দিতে হবে। শিশুকে গরম রাখার জন্য শাল দুধ খাওয়াতে হবে। এর ফলে আপনার শিশুর ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা কম থাকবে।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো :

নবজাতক শিশু জন্মের পর সবকিছু ঠিক থাকলে তাকে সবার আগেই মায়ের বুকের দুধ বা শাল দুধ খাওয়াতে হবে।এতে করে আপনার শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। শিশুর জন্মের পর প্রথম ছয় মাস তাকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়াবেন বাড়তি খাবার দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই।কারণ এই শুধুমাত্র দুধেই তার প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে এবং এর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। আর ছয় মাস পর থেকে বুকের দুধ এর পাশাপাশি ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাবারের চার্ট বানিয়ে নরম খাবার খেতে দিতে পারেন।

গোসল করানো :

শিশুর জন্মের পরপরই তাকে গোসল করানো উচিত নয়। কারণ এতদিন সে মাতৃ গর্ভে উষ্ণ আবহাওয়ার ভেতর ছিল। আর বাইরের আবহাওয়া এবং ভিতরের আবহাওয়া এক না হওয়ার জন্য বাইরের পরিবেশে সাথে এ্যাডজাস্ট করতে তার একটু সময় লাগবে। সেজন্য চিকিৎসকরা বাচ্চা জন্মের সাথে সাথে গোসল করতে নিষেধ করেন। বাচ্চাকে গোসল করাতে হলে আপনাকে শিশুর জন্মের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ের পরে গিয়ে বাচ্চাকে গোসল করাতে পারেন। আর বাচ্চাকে বেশি সময় ধরে গোসল করাবেন না। কারণ বেশি সময় ধরে গোসল করালে আপনার শিশুর ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। আর গোসল করানোর সময় বাচ্চাকে কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করাবেন এবং যেই ঘরে হাওয়া বাতাস নেই এমন জায়গা আপনার শিশুর গোসলের জন্য বেছে নিবেন।

স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা :

সব সময় চেষ্টা করবেন শিশুকে আলো-বাতাস পূর্ণ জায়গায় রাখতে। স্যাঁতসেঁতে বা বদ্ধ পরিবেশ শিশুর জন্য অস্বাস্থ্যকর। এমন জায়গায় রাখলে অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে। তবে ডাইরেক্ট বাতাস আসে এমন জায়গায়ও শিশুকে রাখা যাবে না এতে তার ঠান্ডা লাগার আশঙ্কা বেড়ে যাবে। বাচ্চার জন্য যথেষ্ট এমন বাতাসের জায়গায় তাকে রাখতে হবে।

নাভির যত্ন নেয়া :

শিশুর জন্মের পর তার নাভি নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। কারণ এটি নিজে থেকেই শুকিয়ে পড়ে যায়। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে প্রথম অবস্থায় একবার নাভিতে একটু হেক্সিসল দিতে পারেন। কিন্তু কখনই টানা-হেচাড়া করবেন না এতে আপনার বাচ্চার ক্ষতি হতে পারে।

ত্বকের যত্ন নেয়া :

বাচ্চার ত্বকের যত্ন নেয়ার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের বেবি ক্রিম, পাউডার, লোশন প্রভৃতি ব্যবহার করি। কিন্তু এতে ক্যামিকাল থাকার কারণে উল্টে আরও শিশুর ক্ষতি হবে। তাই এসব জিনিস ব্যবহার না করাই উত্তম। শিশুর ত্বকের যত্ন নেওয়ার জন্য আপনাকে পরিষ্কার এক টুকরা বড় কাপড় নিতে হবে। তা দিয়ে শিশু যখন ঘেমে যাবে তখন তার শরীর বার বার শুকনো নরম কাপড় দিয়ে মুছে দিবেন। আর গোসলের পরেও পাতলা নরম কাপড় দিয়ে শিশুর শরীর আস্তে আস্তে ভালো ভাবে মুছলে শরীর থেকে ময়লা উঠে আসবে। মোছা হয়ে গেলে কাপড়টি ফেলে দিবেন। এরপর শিশুকে পাতলা সুতির নরম এবং আরামদায়ক পোশাক পরাবেন।

ভ্যাকসিন দেয়া :

বাচ্চাকে সময় মতো ভ্যাকসিন দিতে হবে। ভ্যাকসিন দেয়ার ফলে এটি আপনার শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। 

আরও পড়ুন:বাচ্চাকে কখন কিসের টিকা দিতে হয়

পরিশেষে বলা যায় যে,

সি-সেকশনে বাচ্চা প্রসবের পর মা শিশু দুজনের যত্নের দিকেই আমাদের সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ তাদের দুজনের ভিতরে একজনের শরীর খরাপ হলে তার প্রভাব আরেক জনের উপরে পরবে। সময়ে মা শিশু দুজনের যত্নের কোন ত্রুটি না হয় সে জন্য পরিবারের বাকি সদস্যদের উচিত মা শিশুর খেয়াল রাখা। তাই সিজারের পর মা শিশুকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে হলে অবশ্যই উপরিউক্ত যত্নের প্রক্রিয়া গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। আর সেগুলো ঠিকমত অবলম্বন করতে হবে এবং অবশ্যই ডেলিভারির পর একজন প্রসূতি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন।

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
Top