জেনে নিন-সন্তান প্রসবের কত দিন পর মাসিক হওয়া স্বাভাবিক ?

0

 

সন্তান প্রসবের কত দিন পর মাসিক হওয়া স্বাভাবিক ?   সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

ছবি:সংগৃহিত


গর্ভবস্থার আগে পরে একজন নারীর শরীরে বিভিন্ন ধরনের Change বা পরিবর্তন আসে। পিরিয়ড এর পরিবর্তন তার মধ্যে অন্যতম। গর্ভাবস্থা শুরু হওয়ার পর থেকে নারীদের মাসিক বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় মাসের মত তার মাসিক বন্ধ থাকে। দীর্ঘ নয় মাস পরে যখন একজন মা সন্তান জন্ম দেয় তখন আবার প্রাকৃতিক নিয়মেই তার দেহে পিরিয়ড সাইকেল ফিরে আসে। সন্তান প্রসবের পর বেশির ভাগ নারীরাই প্রথম মাসিক নিয়ে অনেকটা টেনশনে থাকেন। কারণ সময় অনেকের পিরিয়ড আগে শুরু হয় আবার অনেকের পিরিয়ড দেরি করে শুরু হয়। তবে এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার করার দরকার নেই। প্রসবের কত দিন পরে পিরিয়ড শুরু হবে এটা কিছু কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। অধিকাংশ মায়েরা এই বিষয় গুলো সম্পর্কে ঠিক মত জানেন না। যার জন্য ডেলিভারির পরে ঋতুস্রাব কেন হচ্ছে না তা নিয়ে শঙ্কায় থাকেন। জন্য প্রসবের পরে মাসিক সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত ধারণা থাকা খুবই জরুরি। 

এখন চলুন প্রসব পরবর্তী মাসিক সম্পর্কিত বিষয় গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই,

 যে  কারণে আপনার মাসিক বিলম্ব হতে পারে ?

সন্তান প্রসবের পরে পিরিয়ড না হওয়ার অন্যতম কারণ হল মায়ের শরীরে থেকে প্রোলাক্টিন হরমোন নিঃসরণ হওয়া। আপনার দেহে যখন প্রোল্যাক্টিন হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে তখন এই হরমোন আপনার শরীরে যে Reproductive Hormone আছে তার নিঃসরণে বাঁধা দিবে। এর ফলে আপনার ডিম্বাশয় তে ডিম্বস্ফুটন হয় না। এই ডিম্বস্ফুটনের বিলম্ব হওয়ার কারণে আপনার ওভুলেশন হয় না বা ডিম্বাণু নিঃসরণ হয় না।  যার জন্য সময় আপনার মাসিক বা ঋতুস্রাব বন্ধ থাকবে।

বাচ্চার জন্মের পর আপনি যখন তাকে বুকের দুধ খাওয়ান তখন আপনার শরীর থেকে প্রোলাক্টিন হরমোন নিঃসরণ হয়। তাই আপনার পিরিয়ড হওয়াটা বুকের দুধ খাওয়ানো অথবা না খাওয়ানোর উপরে অনেকটা নির্ভর করে। আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ নিয়মিত না খাওয়ান অথবা একেবারে বাদ দিয়ে দেন তাহলে আপনার দেহে প্রোল্যাক্টিন হরমোনের মাত্রা হ্রাস পাবে। যার ফলে আপনার পিরিয়ড তাড়াতাড়ি হতে পারে।

তবে আপনার মাসিক না হওয়াটা যে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর উপর নির্ভর করবে এমনটি কিন্তু নয়। অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তন কারণে আপনার পিরিয়ড দেরিতে শুরু হতে পারে।

 সন্তান প্রসবের কত দিন পর মাসিক হওয়া স্বাভাবিক ?

সন্তান জন্মের পর পুনরায় নারীদের পিরিয়ড সাইকেল কখন ফিরে আসাটা স্বাভাবিক এটা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর  উপর কিছুটা নির্ভর করে।তাছাড়া ।আরও কিছু বিষয় আছে এ  গুলো সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে :

প্রসবের পরপরই আপনি যদি শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান সে ক্ষেত্রে আপনার স্বাভাবিক ভাবে পিরিয়ড শুরু হতে দেরি হতে পারে। চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ দের মতে,  প্রসবের পরে যদি কোন মা বাচ্চাকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ান তবে প্রসবের পর মাসিক শুরু হতে চার থেকে ছয় মাস বা তার বেশী সময় লেগে যেতে পারে। অর্থাৎ আপনার বাচ্চা যত তাড়াতাড়ি বুকের দুধ খাওয়া ছেড়ে দিবে তত দ্রুত আপনার মাসিক শুরু হতে পারে।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর একটি অন্যতম উপকারিতা হলো, এই সময়ের মধ্যে পুনরায় আপনার গর্ভধারণ হওয়া রোধ হবে। এর ফলে আপনার শিশুর যত্ন নিতে বা দেখাশুনা করতে কোন প্রকার অসুবিধা হবে না।

বিশেষজ্ঞ দের মতামত অনুসারে, শুধুমাত্র নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের ক্ষেত্রে প্রসবের পর এক বছরের মধ্যে আবার গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ভাগেরও কম। জন্য বেশির ভাগ মায়েরাই বুকের দুধ খাওয়ানোকে প্রসব পরবর্তী জন্ম নিয়ন্ত্রনের মাধ্যম হিসেবে ব্যাবহার করে থাকেন।

শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ালে :

আপনি যদি নিজস্ব ইচ্ছায় অথবা কোন স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে বাচ্চাকে একেবারে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিয়ে শুধুমাত্র ফর্মুলা দুধ খাওয়ান সে ক্ষেত্রে সাধারণত পিরিয়ড আপনার ডেলিভারির হওয়ার থেকে সপ্তাহ পরে শুরু হতে পারে। যদি তিন মাসের মধ্যে আপনার ঋতুস্রাব শুরু না হয় তাহলে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হবে। ডাক্তার আপনার চেক-আপ করে দেখবেন যে আপনার শরীরে কোন সমস্যা আছে কি না। আর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নিশ্চিত হয়ে নিন পুনরায় গর্ভবতী হয়েছেন কি না।

পড়ুন:ফর্মুলা দুধ কি? খাওয়ার নিময় কি এবং ফর্মুলা দুধের চেয়ে বুকের দুধ কেন ভালো?

শিশুকে মিশ্র খাওয়ালে :

আপনি যদি শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো পুরোপুরি বন্ধ না করেন অর্থাৎ আপনি যদি বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুকে ফর্মুলা দুধ খাওয়ান কিংবা আপনার বাচ্চা যদি রাত্রে অল্প বুকের দুধ খায় তাহলে প্রসবের পর ষোল সপ্তাহ বা মাস থেকে মাসের মধ্যেই আপনার মাসিক আরম্ভ হয়ে যেতে পারে।

 এ সময় পুনরায় গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?

অনাকাংক্ষিত গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু ?
ছবি:সংগৃহিত


প্রসবের পর মাসিক শুরু না হলে আপনি গর্ভবতী হতে পারেন। চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ দের মতে একজন নারীর ওভারিতে ওভুলেশন বা ডিম্বোস্ফুটন শুরু হয় মাসিক শুরু হওয়ার দু সপ্তাহ আগে থেকে। জন্য ডেলিভারির পর মাসের মধ্যে যৌন সঙ্গম করলে যদি আপনার ডিম্বাশয়ে ডিম্বোস্ফুটন শুরু হয়ে যায় তাহলে পিরিয়ড শুরু না হয়ে আপনার পুনরায় গর্ভধারণ করার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে।

অধিকাংশ মায়েরাই ডেলিভারির পরে এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করেন। তাই এটা ভাবা খুবই স্বাভাবিক যে, প্রসবের পর ঋতুস্রাব শুরু না হয়েও আপনি আবার গর্ভবতী হতে পারেন।

পুনরায় গর্ভবতী  হতে না চাইলে করণীয় 

আর আপনি প্রসবের পরে যদি পুনরায় গর্ভবতী না হতে চান তাহলে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না। আর যখন যৌন মিলন শুরু করবেন তখন এর সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করা উচিত।

আপনি যদি শিশুকে ব্রেস্ট ফিড খাওয়ানোর মাধ্যমকে জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিতে চান সে ক্ষেত্রে আপনাকে নিচের টি বিষয়ের উপরে লক্ষ্য রাখতে হবে

* ডেলিভারির পরে আপনি যদি পুনরায় গর্ভবতী হতে না চান তাহলে আপনার শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং চার ঘণ্টা পর পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন।

* আর ক্ষেত্রে আপনি যদি বাচ্চাকে স্তন পাম্প করে দুধ খাওয়ান তাহলে কিন্তু হবে না। বাচ্চাকে সরাসরি স্তন থেকে দুধ পান করাবেন।

 আর এভাবে নিয়মিত বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড খাওয়ানোর মাধ্যমে আপনি জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানোর পরে যদি আপনার ঋতুস্রাব শুরু হয়ে যায় তাহলে আপনাকে অন্য পদ্ধতিকে জন্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে হবে।

প্রসবের পর প্রথম মাসিকের ক্ষেত্রে যে সব পরিবর্তন দেখা যেতে পারে ?

প্রসবের পর প্রথম মাসিক হলে আপনার শরীরে যে ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে সে সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো

অনিয়মিত ব্লিডিং হওয়া :

প্রসবের পরে যখন আপনার ঋতুস্রাব শুরু হবে তখন প্রথম দিকে আপনার অনিয়মিত ব্লিডিং হতে পারে। অর্থাৎ সময় আপনার ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পরে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটতে পারে।

সাধারণত প্রসবের পরে আপনার পিরিয়ড কোন নিয়ম না মেনে যে কোন সময় শুরু হয়ে যেতে পারে। এমনকি বাচ্চা জন্ম দেয়ার থেকে সপ্তাহ পরেই হতে পারে। এমনটা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। তাই এটা নিয়ে চিন্তা করবেন না।

অতিরিক্ত মাত্রায় ব্লিডিং হওয়া :

মাসিকের অতিরিক্ত মাত্রায় ব্লিডিং হওয়া


ডেলিভারির পরে প্রথম পিরিয়ড হলে আপনার পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়ার সাথে সাথে  অস্বাভাবিক ভাবে অতিরিক্ত মাত্রায় ব্লিডিং বা রক্ত ক্ষরণ হতে পারে। এই পিরিয়ডের রক্তপাতের মাত্রা গর্ভাবস্থা শুরুর আগের রক্তপাতের মাত্রার তুলনায় অনেক গুণ বেশি থাকে। সাধারণত মাসিকের শুরুতে আপনার রক্ত ক্ষরণ বেশি হবে। আর এমনটা হলে ভয় না পেয়ে প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নিবেন।

বেদনাদায়ক ক্র্যাম্পিং হওয়া :

বাচ্চা ডেলিভারি হওয়ার পরে আপনার  ইউটেরাস বা জরায়ুর প্রচীর আগের থেকে অনেক বেশি মোটা হয়ে যায়। যার জন্য সময় আপনার তলপেটে ক্র্যাম্প আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

 

ছাড়াও এই সময় আপনার আগের থেকে তলপেটে বেশি বেদনাদায়ক ব্যথা বা টান টান অনুভব হতে পারে এবং সেই সাথে মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক ঘাম এবং খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আর রকম হলে টেনশন করবেন না। প্রসবের পরে মাসিক হলে এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর থেকেই সব কিছু আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে দেয়।

পড়ুন:Insomnia বা নিদ্রাহীনতা আপনার শরীরে মারাত্নক প্রভাব ফেলতে পারে 

 অবশেষে আমরা বলতে পারি যে,

বাচ্চা প্রসবের পরে মাসিকের শুরু হওয়ার কোন নির্দিষ্ট সময় সীমা থাকে না। অর্থাৎ এই সময় একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। ডেলিভারির পরে আপনার পিরিয়ড দ্রুত হওয়ানোর জন্য সব সময় আপনাকে নিজের সঠিক যত্ন নিতে হবে। আর তার পাশাপাশি প্রচুর পরিমানে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। তবে উক্ত নিরাপদ সময়ের মধ্যে যদি আপনার ঋতুস্রাব বা মাসিক না হয় তাহলে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ প্রসূতি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে আপনাকে পরামর্শ নিতে হবে তাহলে সহজেই আপনি প্রসবের পরে মাসিক সংক্রান্ত জটিলতা গুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
Top