অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে শরীরে যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে ?

0

 

 

আপনি কি অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যায় ভুগছেনএর কারণে আপনার শরীরে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে ? সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে শরীরে যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে ?
ছবি :সংগৃহিত

আধুনিকতার যুগে প্রায় অধিকাংশ নারীরা এখন Irregular Period বা অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যায় ভুগছেন। বিশ্লেষকরা, নারীদের এই সমস্যার পেছনে তাদের অনিয়ন্ত্রতিত জীবনযাপন করাকে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দায়ী কারছেন। যার জন্য বিশ্বব্যাপি প্রতিনিয়ত ঋতুস্রাবের সমস্যায় ভুক্তভোগী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা তাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক নারী আছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত মাসিকের সমস্যায় ভুগছেন কিন্তু তার পরেও তারা এই সমস্যা নিরাময়ের জন্য লজ্জাশীলতার কারণে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে চান না। ঋতুস্রাব নিয়মিত না হলে এটি আপনার শরীরের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং পরবর্তীতে এর থেকে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে সৃষ্ট সমস্যা গুলো সম্পর্কে অনেকেরই অজানা রয়েছে যার কারণে নারীরা এই সমস্যার নিয়ন্ত্রণে কোন প্রকার পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। এজন্য Irregular Period বা অনিয়মিত ঋতুস্রাবের ক্ষতিকর দিক গুলো সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে আপনার শরীরে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে ?

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে আপনার শরীরে যে সব জটিলতা দেখা দিতে পারে সে সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে আপনার শরীরে কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে ?
ছবি :সংগৃহিত

রক্তস্বল্পতা দেখা দেওয়া :

দীর্ঘদিন ধরে যদি আপনি অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যায় ভুগেন এবং পিরিয়ডের সময় যদি রক্তক্ষরণের প্রভাব অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যায় তাহলে আপনার রক্তে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক সংখ্যার চেয়ে অনেক কমে যেতে পারে। এর ফলে আপনার শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যার থেকে পরবর্তীতে আপনার Anemia বা রক্তস্বল্পতা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া :

অনিয়মিত পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের কারণে যদি আপনার ব্লিডিং বা রক্তপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায় তাহলে আপনার রক্তের ভিতরে অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে শ্বাসনালীতে ঠিকমত অক্সিজেন বা বাতাসের আদান-প্রদান না থাকার কারণে সময় আপনার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট বা শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা :

পিরিয়ডের এই সমস্যার কারণে আপনার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় মিনারেল বা খনিজ পদার্থগুলো আপনার শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। এর ফলে আপনার শরীর অনেক দূর্বল হয়ে পড়তে পারে। সে জন্য সময় আপনার অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।

বেদনাদায়ক ক্র্যাম্পিং হওয়া :

আপনার যদি অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা মাসিকের সমস্যা থাকে তাহলে আপনার মাসিক না হওয়া সত্ত্বেও আপনার তলপেটে প্রচন্ড ব্যথা বা ক্র্যাম্পিং হতে পারে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বেদনাদায়ক ক্র্যাম্পিং বলা হয়ে থাকে। ঋতুস্রাবের বিলম্বের কারণেই মূলত আপনার তলপেটে বেদনাদায়ক ক্র্যাম্পিয়ের লক্ষ্মণ প্রকাশ পেতে পারে।

ডিসমেনোরিয়া বা বেদনাদায়ক মাসিক :

ডিসমেনোরিয়া বা বেদনাদায়ক মাসিক :
ছবি :সংগৃহিত


পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব নিয়মিত না হলে আপনার মাসিক শুরু হওয়ার আগে বা মাসিক চলাকালীন সময়ে Heavy Bleeding বা ভারী রক্তপাতের এর সাথে সাথে তলপেটের চারপাশে প্রচন্ড ব্যথা করতে পারে এবং এই ব্যথা পিঠেও ছড়িয়ে পড়তে পারে যা স্বাভাবিক পিরিয়ডের ব্যথার তুলনায় ভিন্ন হয়ে থাকে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ডিসমেনোরিয়া বা বেদনাদায়ক মাসিক বলা হয়ে থাকে।

মাথা ব্যথা করা :

Irregular Period বা দুই মাস পরে পিরিয়ড হলে আপনার Vaginal Bleeding বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে মানসিক চাপ বা টেনশনের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। আর মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে আপনার মাথা ব্যথা করতে পারে। 

Heart disease বা হৃদরোগের সমস্যা :

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যেসব নারীরা অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা মাসিকের সমস্যায় ভুগছেন তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। তার কারণ, আপনার মাসিক যদি ঠিক মত না হয় তাহলে শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় রক্তের সাথে তরল পদার্থ গুলো বের হতে পারে না। এর ফলে আপনার ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে এবং সহজে কমানো সম্ভব হয় না এবং রক্তে কোলেস্টেরল পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। যার ফলে আপনার Heart Disease বা হৃদরোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

Arthritis বা বাঁত রোগ :

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা মাসিকের সমস্যায় ভুগলে শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ধীরে ধীরে আপনার মেরুদন্ডের হাড়গুলো দূর্বল বা অবশ হয়ে যেতে থাকে।  এর থেকে পরবর্তীতে আপনার Athritis (হাড়) বা বাঁত রোগে  আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।

সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা কমে যাওয়া :

নিয়মিত পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব না হলে আপনার ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর পরিস্ফুটন ঠিক মত হয় না। এর ফলে ধীরে ধীরে আপনার সন্তান ধারণ করার ক্ষমতা বা প্রেগন্যান্সির হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। 

ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়া :

অনিয়মিত ঋতুস্রাবের কারণে আপনার রক্তের সাথে মাত্রারিক্ত বা স্বল্প পরিমাণ গ্লুকোজ বা শর্করা, কোলেস্টেরল জাতীয় পদার্থ বের হয় এবং হরমোনের নিঃসরণে তারতম্য দেখা দিতে পারে।  যার কারণে ওজন অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যেতে পারে অথবা কমে যেতে পারে। আর ওজনের অস্বাভাবিকতার কারণে আপনার শরীরে নানা ধরনের জটিল রোগ যেমন : স্ট্রোক, টিউমার, ক্যান্সার ইত্যাদি দেখা দেয়ার চরম সম্ভাবনা রয়েছে।

ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রায় ভুগা :

পিরিয়ড নিয়মিত না হলে আপনার মানসিক দুশ্চিন্তা বা চাপের প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। এই মানসিক চাপের কারণে আপনার ব্রেন বা মস্তিষ্কের ভিতরে অস্বস্তি কাজ করতে পারে। যার ফলে পরবর্তীতে আপনার স্বাভাবিক ভাবে ঘুমানোর পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ :

বিবাহিত নারীরা হঠাৎ করে যদি জন্ম নিয়ন্ত্রণ ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয় তাহলে তাদের অনিয়মিত ঋতুস্রাবের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

মেজাজ পরিবর্তন হওয়া :

ঋতুস্রাবের অস্বাভাবিকতার কারণে আপনার মেজাজের পরিবর্তন হতে পারে। সময় আপনার শরীরের ভিতরে হিট বা তাপ বেড়ে যেতে পারে যার কারণে আপনার অনেক গরম বা অস্বস্তি অনুভুত হতে পারে এবং সময় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে হুটহাট করে মেজাজ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে আপনি খিটখিটে স্বভাবের হয়ে যেতে পারেন।

 

পরিশেষে বলা যায় যে, 

ঋতুস্রাব বা Period হল  প্রতিটি নারীর জীবনে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর ফলে প্রতি মাসে নারীর শরীর থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্ত যোনীপথ দিয়ে বেরিয়ে যায়। আর এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যদি অনিয়ম ঘটে তখন তাকে অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা Irregular Period বলা হয়। আর সময়মতো যদি এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে পরবর্তীতে এর থেকে আপনার শরীরে উপরিউক্ত জটিল রোগ গুলো সৃষ্টি হতে পারে এমনকি আপনার গর্ভধারণের পথে মারাত্মক বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য এই সমস্যাটিকে আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে এবং এর সমস্যা বুঝতে পারার সাথে সাথেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের চিকিৎসা করালে আপনি সহজেই এই রোগ থেকে মুক্তি পাবেন এবং সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। তাই আপনি যদি অনিয়মিত ঋতুস্রাব বা Irregular Period এর সমস্যা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে এর ক্ষতিকর প্রভাব গুলো বিশেষ নজরে রাখতে হবে সেই সাথে জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে হবে এবং অবশ্যই সময়মতো ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবো। 

 

 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
Top