পেটের সমস্যা কেন হয় ? হজমের সমস্যা দূর করার উপায়

0

 

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিভাবে আপনি হজমের সমস্যা দূর করবেন ? সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

পেটের সমস্যা কেন হয় ? হজমের সমস্যা দূর করার উপায়
পেটের সমস্যা ছবি সংগৃহিত

হজমের সমস্যা বা বদহজম খুবই কমন একটি সমস্যা। আমরা সবাই কম বেশি এই সমস্যায় ভুগে থাকি। আর এই সমস্যা দেখা দিলেই আমরা সব সময় আশে-পাশের ওষুদের দোকান থেকে গিয়ে গ্যাসের ট্যাবলেট কিনে খাই। তবে এসব ট্যাবলেট খেলে শুধুমাত্র অল্প সময়ের জন্য এই প্রবলেম থেকে উপশম পাওয়া যায়। পরবর্তীতে পুনরায় এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর আমরা অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে দোকান থেকে গ্যাসের ওষুধ  কিনে খায়। এরকম করে তারা দীর্ঘদিন যাবত আন্দাজে এ্যাসিডিটির সমস্যার জন্য ওষুধ খেয়ে যাচ্ছেন। এতে আরও আমাদের শরীরে এসব ট্যাবলেটের সাইড ইফেক্ট দেখা দিয়ে পরবর্তীতে হিতের বিপরীত হতে পারে। তবে আমরা যদি ঘরোয়া টোটকার মাধ্যমে হজমের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করি তাহলে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই দ্রুত এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাব। কিন্তু অধিকাংশ লোকজনই এই ঘরোয়া টোটকা সমন্ধে জানেন না। 

তাই আসুন আমরা হজমের সমস্যা দূর করার ঘরোয়া উপায় গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই-

হজমের সমস্যা কি বা কেন হয় ?

হজমের সমস্যাকে আমরা সাধারণত বদহজম নামে বেশি ডেকে থাকি। আর এই সমস্যা হয় মূলত যখন আমাদের পাকস্থলী বা খাদ্যনালীতে অতিরিক্ত বা ভারসাম্যহীন ভাবে এসিড উৎপন্ন হয় তখন। আর এই এসিড আমাদের খাদ্যনালীতে গলবিল থেকে আগত খাদ্যবস্তুকে ঠিক মত প্রশমিত বা হজম করতে পারে না। যার ফলে আমাদের পেটে অ্যাসিডিটির সৃষ্টি হয় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বদহজম বা হজমে গন্ডগোল বলে।

ঘরোয়া পদ্ধতিতে কিভাবে আপনি হজমের সমস্যা দূর করবেন ?

ঘরোয়া পদ্ধতিতে হজমের সমস্যা দূর করার উপায় গুলো সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো

সময়মতো খাবার খাওয়া :

হজমে গন্ডগোল হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ গুলোর মধ্যে একটি হল সময়মতো খাবার না খাওয়া। একটু বুঝিয়ে বলা যাক, আপনি যদি দুই বেলার খাবার খাওয়ার মাঝে বা খুব কম সময়ের বিরতি দেন তাহলে আপনার খাদ্যনালীতে খাদ্যবস্তু ঠিক মত পরিপাক হবে না। আবার আপনি যদি খাবার খাওয়ার মাঝে দীর্ঘ সময়ের বিরতি রাখেন তাহলে আপনার পাকস্থলীতে এসিড জমে গ্যাসের সৃষ্টি করতে পারে যা বদহজমের অন্যতম কারণ। তাই সব সময় চেষ্টা করবেন প্রতি বেলাট খাবার খাওয়ার মাঝে খুব দীর্ঘ সময় কিংবা খুব স্বল্প সময়ের বিরতি না রাখতে। আর খাবার খাওয়ার মাঝে সমান বিরতি রাখবেন এবং কোন বেলার খাবার খাওয়া বাদ দিবেন না।

হালকা গরম পানি :

হালকা কুসুম গরম পানি আপনাকে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। তার মধ্যে হজমের সমস্যা একটি। হজমের সমস্যা ছাড়াও  আপনার শরীরে যদি কোন প্রকার ব্যথা যেমন : গলা ব্যথা, পেটে ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা প্রভৃতি থাকে সে গুলো দূর করতে কুসুম গরম পানি খুবই কার্যকরী। হজমের গন্ডগোল থেকে রেহাই পেতে হলে আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা পানি  গরম করে খালি পেটে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি পান করুন। এটি আপনার পেটের সমস্যা দূর হওয়ার পাশাপাশি যদি পেট ফাপা ফাপা ভাব থাকে তাহলে সেটিও শীঘ্রই দূর হয়ে যাবে।

 আপেল :

বদহজমের সমস্যা দূর করতে আপেল খুবই কার্যকরী একটি খাবার। আপেল এর ভেতরে রয়েছে ফাইবার এবং পেকটিন সমৃদ্ধ উপাদান। যা আপনার হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে।  আপেল খাওয়ার জন্য আপনি একটি আপেল নিয়ে সেটি ভাল মত সেদ্ধ করে তার রস বানিয়ে খেলে আপনার হজম ক্ষমতা বাড়বে। এভাবে যদি ঝামেলার মনে হয়, তাহলে আপনি প্রতিদিন খালি পেটে কাঁচা আপেল খেতে পারেন। এতেও একই উপকার পাবেন। তবে আপেল সব সময় সকাল বেলা খাবেন। কখনই বিকালে রাতে আপেল খাবেন না,  খেলে কিন্তু গ্যাস হবে। চেষ্টা করবেন প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে নিয়মিত আপেল খেতে, তাহলে আপনার বদহজমের সমস্যা দূর হবে।

কাঁচা হলুদ :

কাঁচা হলুদ আপনার হজম সমস্যা দূর করতে অনেক ভাল কাজ দিবে। কাঁচা হলুদের ভেতরে কিছু গ্যাস্ট্রো-প্রটেক্টিভ গুণ যেমন : অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি অ্যান্টি- অক্সিড্যান্ট প্রভৃতি জাতীয় উপাদান রয়েছে। যা আপনার খাদ্যনালীতে গলবিল থেকে আগত খাদ্যবস্তু পরিপাকে সাহায্য করবে। এর ফলে আপনার বদহজমের ছাড়া এর পাশাপাশি খাদ্যনালীকে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে সহায়তা করবে। তাই হজমের সমস্যা দূর করতে হলে প্রতিদিনের খাবারের সাথে এক টুকরো কাঁচা হলুদ বা কাঁচা হলুদ গুঁড়া মিক্সড করে খাবার রান্না করে খেতে পারেন।

জিরার পানি :

জিরার অনেক গুণের কথা আমরা শুনে থাকি। তার মধ্যে অন্যতম একটি গুণ হল জিরা বদহজমের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি পেটে যদি গ্যাস জমা থাকে তা কমাতে এবং হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে বদহজম দূর করার জন্য আপনি এক চা চামচ জিরা গুড়ো করে গুঁড়া পানিতে মিশিয়ে ভাল করে জ্বাল দিবেন। পানির জ্বাল যখন বাদামী বর্ণ হয়ে আসবে তখন পানির জ্বাল নামিয়ে ফেলবেন। এরপর যখন মিশ্রণটি ঠান্ডা হয়ে আসবে তখন মিশ্রণটি পান করবেন। এভাবে দিনে তিন থেকে চার বার মিশ্রণটি পান করবেন। দেখবেন, উপকার পাচ্ছেন। এছাড়া আপনার পেটে যদি অতিরিক্ত মেদ জমে তা কমাতে এবং পেটে ব্যথা হ্রাস করতে জিরার পানি সহায়তা করবে।

 এলাচ :

অ্যাসিডিটির প্রবলেম সমাধান করতে এলাচ অনেক ভাল কার্যকরী একটি মশলা। এলাচের মধ্যে এমন কিছু ওষুধি উপাদান রয়েছে যা আপনার খাদ্যনালীতে খাদ্যবস্তু পরিপাকে সাহায্য করার পাশাপাশি Digestive system কে সক্রিয় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এলাচ খাওয়ার জন্য আপনি একটি এলাচ নিয়ে তা ছেঁচে  ফেলুন। এরপর এক কাপ পানি গরম করে   ছেঁচা এলাচ গরম পানির ভেতর দিয়ে দিন। এরপর সেই পানি পান করুন। উপাকার নিজেই বুঝতে পারবেন। এভাবে এলাচ খেতে না চাইলে তাহলে আপনি প্রতিদিন একটা করে এলাচ চিবিয়ে খান। এতে সমান উপকার পাবেন।

পেঁপের পাতা :

হজমের গন্ডগোল ঠেকাতে পেঁপের পাতা খুবই উপকারী একটি খাবার। পেঁপে পাতায় ভেতরে রয়েছে এনজাইম। যা আপনার পাকস্থলীতে আসা খাবারে থাকা প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেড এবং মিনারেল ভাঙতে সাহায্য করবে। এর ফলে খাদ্যবস্তু দ্রুত হজম হবে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি পাবে। পেঁপে পাতার খেতে হলে আপনি একটি সতেজ পেঁপের পাতা নিয়ে তা সেদ্ধ করে সেই পানি পান করুন। আর এভাবে প্রতিদিন সকালে এই পানি খাবেন। দেখবেন উপকার পাচ্ছেন। এছাড়াও পেঁপের পাতাতে রয়েছে High Anti-inflammatory উপাদান। যা আপনার পেটের প্রদাহ, আলসার বা ঘা এবং মলাশয়ের প্রদাহ প্রভৃতি হ্রাস করতে সহায়তা করবে।

আদা :

আদা বহু গুণে গুণাণ্বিত একটি খাবার। আদার ভেতরে কার্যকরী উপাদান রয়েছে। যা আপনার হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করবে। হজমে গন্ডগোল দূর করার জন্য আপনি বেশ কয়েকটি নিয়মে আদা খেতে পারেন। নিয়ম গুলো হল

* আদা খাওয়ার জন্য আপনি প্রথমে এক কোয়া আদা নিয়ে তা রস বানিয়ে নিন। এরপর সেখান থেকে দুই চা চামচ আদার রস নিন। এর সাথে এক চা চামচ লেবুর রস মিক্সড করুন। এরপর এক চিমটি নুন মিশিয়ে খেয়ে নিবেন।

* শুধু রস খেতে ইচ্ছা না করলে রসের সাথে গরম পানি এবং এক চা চামচ মধু মিশিয়ে মিশ্রণ বানিয়ে মিশ্রণটি পান করুন।

* আবার তরকারি রান্না করার সময় আদা ব্যবহার করতে পারেন কিংবা সকাল-বিকালে আদা চা বানিয়ে খেতে পারেন। এতে হজমের জন্য ভাল উপকার পাবেন। 

আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া :

ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার আপনার বদহজমের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করবে। আমাদের পাকস্থলীতে থাকে হাজারো অণুজীব। উপকারী অণুজীব , অনুপকারী অণুজীব এই দুই ধরণের অণুজীব রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে উপকারী অণুজীব গুলো হজমে সহায়তা করবে। আমরা যেসব আঁশ জাতীয় খাবার খাই এসব খাবার উপকারী অণুজীব গুলো খায়। এই উপকারী অণুজীব গুলোকে বলে প্রোবায়োটিক। আর এরা যেসব আঁশজাতীয় খাবার খাচ্ছে তাদেরকে বলা হয় প্রিবায়োটিকস। তাই হজম শক্তি বাড়ানোর জন্য আপনি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়  ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবার যেমন : সবুজ শাক-সবজী, ফলমূল, ডাল, মটরশুটি, গাজর, বাদাম, শস্য, লাল চাল, লাল আটা প্রভৃতি বেশি করে রাখবেন।

মৌরির দানা :

হজমের গন্ডগোল ঠেকাতে মৌরির দানা বেশ ভাল কাজ দিবে। মৌরি দানাতে Natural oil রয়েছে। এই তেল আপনার দীর্ঘ দিনের পেটের ব্যমোকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। অতিরিক্ত মসলাদার বা ঝাল জাতীয় খাবার খাওয়ার কারণে যদি আপনার বদহজম হয় তখন আপনি মৌরির দানা খেতে পারেন। এটি বদহজম দূর করার পাশাপাশি হজম শক্তি বৃদ্ধি করবে।

* মৌরির দানা খাওয়ার জন্য আপনি এক কাপ পানি নিয়ে সেই পানি ফুটিয়ে নিয়ে গরম পানির সাথে দুই চা-চামচ মৌরি দানা মিশিয়ে পানীয়টি পান করুন।

* এছাড়া আপনি প্রথমে মৌরি দানা ভাল করে শুকিয়ে নিবেন। এরপর সেগুলোকে ভেজে  গুঁড়া করে নিবেন। সেখান থেকে এক চা-চামচ মৌরি দানার গুঁড়া নিয়ে পানির সাথে মিশিয়ে মিশ্রণটি পান করুন। এভাবে দিনে দুই বার পানীয়টি পান করুন।

* আপনার যদি মিশ্রণ বানিয়ে খেতে ইচ্ছা না করে তাহলে শুধু মৌরি দানা চাবিয়ে খান এতেও অনেকটা উপকার পেতে পারেন।

বেকিং সোডা :

অনেক সময় অ্যাসিডিটির সমস্যার কারণে বদহজমের প্রবলেম হয়ে থাকে। বেকিং সোডাতে থাকা ক্ষারীয় উপাদান আপনার পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত এসিডকে প্রশমিত করতে সহায়তা করবে। বেকিং সোডা খাওয়ার জন্য আপনি হাফ গ্লাস পানির মধ্যে দেড় চা চামচ বেকিং সোডা এ্যাড করে সেই পানি পান করুন। এভাবে খেতে পারলে আপনার দীর্ঘ দিনের বদহজমের সমস্যা দূর হওয়ার পাশাপাশি পেটের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করবে।

ভেষজ চা :

চা আমাদের সবার কাছে প্রিয় একটি পানীয়। বাজারে বিভিন্ন ধরনের চা এর টি ব্যাগ কিনতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে থেকে হজমের গন্ডগোল ঠেকানোর জন্য ভেষজ চা কিনবেন। হজমের সমস্যার দূর করার জন্য পেপারমিন্ট এবং ক্যামলাই টি বেশ কার্যকরী। ভারী খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে এক কাপ ভেষজ চা খেয়ে নিবেন। এটি আপনার খাদ্যবস্তু দ্রুত হজম করতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও আপনার পেটের জ্বালা-পোড়া এবং অস্বস্থিকর অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে এই চা অনেক ভাল কাজ দিবে।

শেষ কথা :

হজমের সমস্যা আমাদের সবার কাছে সামান্য প্রবলেম মনে হলে দীর্ঘ দিন যাবত যদি আমরা এই প্রবলেম আমাদের দেহে পুষে রাখি তাহলে এর থেকে পরবর্তীতে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ যেমন : গ্যাস্ট্রিক আলসার, ক্যান্সার প্রভৃতি দেখা দিতে পারে। যা আমাদের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার পঘে বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আমাদের উচিত সময় থাকতে উপরিউক্ত উপায় গুলো অনুসরণ করে এই সমস্যার সমাধান করা।

Category

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept!) #days=(7)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
Top